Satkahonbd | সাতকাহন
সত্যের সন্ধানে

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে!

সরকার সব ধরণের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। শুধু তেল নয়, দাম বাড়ানো হয়েছে এলপি গ্যাসেরও। তাও ১৭ দিনের মধ্যে দু’বার। তাতে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের মোট দাম বেড়েছে ৫৯৯ টাকা (৩৮৭+২১২)। ফলে সিলিন্ডারটির সরকার নির্ধারিত দাম এখন ২,০৫০ টাকা! সাধারণ মানুষ কত টাকায় পাবেন তা ঠিকঠাক বলা সম্ভব নয়। এরপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। মূলত: বিদ্যুত উত্‌পাতনের জন্য ব্যবহৃত ফার্নেস তেল এবং বিমানের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম আগেই বাড়ানো হয়েছে। এই দাম বৃদ্ধি আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে!
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকারের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সেই পুরানো প্রশ্নই আবারো ওঠে যে সামঞ্জস্য রাখার প্রসঙ্গটি কেবল দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেই ওঠে কেন? বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানির দাম কমে তখন তো সামঞ্জস্য বিধানের প্রসঙ্গ ওঠে না! কেন জ্বালানির দাম নির্ধারণের সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি অনুযায়ী জ্বালানির দাম বিশ্ববাজারের ওঠা-নামার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয় না যাতে দাম বাড়া-কমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশেও দাম বাড়তে-কমতে পারে!
আমাদের দেশে কয়েক দশক ধরে এই পদ্ধতি চালু করার কথা হয়ে আসছে। কথাগুলো এসেছে মূলত: ভোক্তাস্বর্থ বিবেচনা করে। দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এবং গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নানানভাবে বিষয়টির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সরকার সব সময়ই বিষয়টি নিয়ে কালক্ষেপন করার কৌশল নিয়েছে। কখনোই মানুষকে জ্বালানির কম দামের সুবিধা দেয়নি। এর কারণ হলো রাজস্ব উপার্জন। জ্বালানি খাত থেকে সরকার আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, বিতরণ কোম্পানিগুলোর আয়কর প্রবৃতি সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ রাজস্ব হিসোবে নেয়। জ্বালানির দাম যত বেশি হয় সরকারের রাজস্বও ততই বাড়ে। এরপর আছে বিপিসির মুনাফা। সরকার সেখান থেকেও আয়কর এবং মুনাফার একটা অংশ নেয়। জ্বালানির দাম কম হলে সরকারের রাজস্বের পরিমানও কমে। সুতরাং রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য হাহাকারে থাকা সরকার ওই পথে হাঁটতে চায় না।
বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল অংকের ভর্তুকি দিতে হয় সত্য। এই ভর্তুকি দেওয়া হয় বলেই দেশের শিল্প, কৃষি, সেবাসহ সকল উতপাদন খাত বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারছে। বিদ্যুত ও জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি তুলে দেওয়া হলে বাংলাদেশের দেউলিয়া হতে বেশি সময় লাগবে না, তা আইএমএফ যত কথাই বলুক না কেন।
কিন্তু বিপিসির মুনাফা! সরকারের বিপুল পরিমান ভর্তুকির ঘাড়ে সওয়ার হয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসি যে বাণিজ্য করে যাচ্ছে তার জবাব কী? এই গত অর্থবছরেও (২০২৪-২৫) জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি নিট মুনাফা করেছে ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতিদিন বিপিসির নিট মুনাফা হয়েছে ১১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর বাইরে ওই অর্থবছরে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, আয়কর এবং লভ্যাংশ বাবদ বিপিসি সরকারকে দিয়েছে মোট ১৩ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অবাক করা বিষয় হলো-দেশের জনগণের সাথে সরকারের ও একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সরাসরি এবং সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে এই জ্বালানি তেল। অথচ সরকার কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিন্তু সেবার নামে জনগণের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারে না। বিপিসির এই মুনাফা এবং সরকারকে দেওয়া অর্থের হিসাব তাঁদের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটা তো এক বছরের হিসাব। বিপিসি কম-বেশি মুনাফা করে প্রতিবছর। এবছরও ফেব্রুয়ারি মাস পর্‌যন্ত তো বিপিসি মুনাফাই করেছে। তাই দেশ ও জনগণের জন্য বিপিসি কিছুদিন যদি লোকসানও দেয় তাহলেও প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হওয়ার কোনো আশংকা নেই। শুধুমাত্র পূর্ববর্তী মুনাফার সঙ্গে এই সময়ের লোকসান সমন্বয় হতে থাকবে। অপরদিকে এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও বন্ধ হবে না। তবে কম-বেশি হবে। যেমন জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে এখন সরকার আগে চেয়ে অনেক বেশি পরিমানে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট প্রভৃতি পাবে। অথচ লোকসান, প্রতিদিন শতকোটি টাকার ভর্তুকি, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান প্রভৃতি কারণ দেখিয়ে এযাবতকালের মধ্যে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের সুযোগ ছিল অন্তত: আরো কিছুদিন দাম না বাড়িয়ে, সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা।
এই দাম বৃদ্ধির প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া কী হবে! সারা পৃথিবীতে জ্বালানিকে গন্য করা হয় ‘স্ট্রাটেজিক কমোডিটি’ বা কৌশলগত পন্য হিসেবে। এর প্রধান কারণ জ্বালানির উত্‌পাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পুরো আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর তার অনিবার্‌য বিরূপ প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা। জ্বালানি ছাড়া গোটা অর্থনীতি পঙ্গু। শিল্প-বাণিজ্য-কর্মসংস্থান ব্যাহত। যাতায়াত-পরিবহন দুর্মূল্য ও বিঘ্নিত। ইতিমধ্যে বাসভাড়া ৬৪ শতাংশ এবং লঞ্চভাড়া ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মালিক পক্ষগুলো। বিদ্যুত উত্‌পাদন ব্যাহত। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। এগুলো সরকার বা নীতিনির্ধারকেরা যে জানেন না তা তো নয়। তারপরও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার কী অর্জন করতে চায়? সরকারের অগ্রাধিকারই বা কিসে? জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার কি তেমন কোনো চক্রব্যুহে ঢুকেছে যেখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন?
সবারই জানা আছে যে বর্তমান বিএনপি সরকার অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। গত তিন বছর ধরে মোট দেশজ উত্‌পাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান নেই। দেশের আর্থিক খাত সংকটে আছে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি যা জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর ডাবল ডিজিটে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে মানুষের সীমিত হয়ে আসা ক্রয়ক্ষমতা আরো কমিয়ে দেবে। নিম্ন আয়ের মানুষ আরো বেশি বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়বে। রাজস্ব আয় কমে গেছে। ফলে সরকার ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা করার পথে পা বাড়াতে পারছে না। প্রবাসী আয় বেড়েছে বটে। তবে রপ্তানি খাত দুর্বলতর হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। রপ্তানি আরো দুর্বল হতে পারে। প্রবাসী আয় কমতে পারে। তাতে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার কী অর্জন করতে চাইছে? শুধু কিছু রাজস্ব এবং বিপিসির মুনাফা? জ্বালানির দাম বাড়িয়ে আর কিছু তো অর্জন করা সম্ভব নয়। অথচ সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল প্রায় ৫ বছর ধরে চলে আসা মূল্যস্ফীতি কমানো। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়ানোয় তা আরো বাড়বে।
বর্তমানে যে মূল্যস্ফীতি তা ধারাবাহিকভাবে চলে এসেছে মূলত: ২০২২ সাল থেকে। ওই বছরের আগস্টে দেশে একবারে অতি উচ্চহারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরই মূল্যস্ফীতি অনেকটা বৃদ্ধি পায়। ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারের জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। তারই প্রত্রিক্রিয়ায় ২০২২ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৮০ থেকে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, অকটেন ৮৯ টাকা থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ এবং পেট্রোল ৮৬ থেকে ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করেছিল। ওই সময় ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য যথাক্রমে ৪২.৫, ৫১.৭ এবং ৫১.২ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছিল| এবার মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দেড় মাস পর বিএনপি সরকারের নির্ধারণ করা নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলল ১১৬ টাকা থেকে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শতাংশের হিসাবে ওই সময়ের তুলনায় এবার দাম বৃদ্ধি কম হলেও ওই সময়ের বর্ধিত দামের ওপর এবারের বর্ধিত দাম মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভুত হওয়ার আশংকা রয়েছে। গত শনিবার দুপুরে সরকারের একজন নীতিনির্ধারক ‘জ্বালানির দাম বাড়লে মূল‍্যস্ফীতি বাড়বে-তাই দাম বাড়াবে না সরকা ‘ বলার কয়েক ঘন্টার মধ্যে জ্বালানি মন্ত্রীর ভাষায় “বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে” হলো। অনেকের ধারণা, সরকার এখনই জ্বালানির দাম বাড়ানোর কথা ভাবছিল না। কিন্তু তাতে আইএমএফের ঋণের আগামী কিস্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও আইএমএফের একই প্রেসক্রিপশন মানতে হয়েছে। তাই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের প্রতিনিধিদলের বৈঠকের পর দাম বাড়ানোর মধ্যে সম্পর্ক খোঁজা অমূলক নয়।
দেশের অন্তত: এক কোটি পরিবারের নির্ভরতা এলপি গ্যাসের ওপর। এপ্রিলের শুরুতেই ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম তখনকার এক হাজার ৩৪১ টাকা থেকে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৭২৮ টাকা করা হয়। এরপর গত শনিবার, জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলপি গ্যাসের দামও আরেক দফায় ২১২ টাকা বাড়ানো হলো। ফলে মাত্র ১৭ দিনের ব্যবধানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়লো ৫৯৯ টাকা। ফলে এলপি গ্যাসনির্ভর পরিবারগুলো বড় ধরণের আর্থিক চাপে পড়বে। ডিজেলের দামের জন্য চাপে পড়বে কৃষক। আসলে চাপে পড়বে সমগ্র দেশের অর্থনীতি ও মানুষ।
সাতকাহন প্রতিবেদক

You might also like