দেশে জ্বালানি তেলের যে মজুত এখন আছে তাতে চলতি মার্চ মাসের প্রায় পুরো চাহিদাই মেটানো যাবে। তার ওপর গতকাল শনিবার তেল-গ্যাস নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে মোট ১০টি জাহাজ। এর মধ্যে ৪টিতে তেল, ৪টিতে এলএনজি এবং ২টিতে এলপি গ্যাস। সর্বোপরি আগামীকাল সোমবার জ্বালানি তেলবাহী আরো ২টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সুতরাং দেশে জ্বালানি তেলের সংকট হবে এমন আশংকা আপাতত: নেই।
অনেকে ধারণা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সংকট হতে পারে। যদি তা হয়ও তাহলেও তো এখন বেশি করে জ্বালানি তেল কিনে রেখে সেই সংকট মোকাবেলা করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। দ্বিতীয় কথা হলো, ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করলেও সম্পূর্ণ বন্ধ করবে না, তা যুদ্ধ পরিস্থিতি যেমনই হোক। ফরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল সীমিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে অন্য উত্স থেকে ভিন্ন পথে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চালু থাকবে যার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং অতংকিত হওয়ার দরকার নাই। আতংকিত হয়ে কোনো লাভও নাই, অযথা বিশৃংখলা সৃষ্টি করা ছাড়া।
২০২৪-২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশে অকটেনের চাহিদা বছরে সোয়া ৪ লাখ টনের কম। সে হিসাবে প্রতিদিন অকটেনের চাহিদা গড়ে ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টনের কিছু বেশি। কিন্তু ‘আতঙ্কের কেনাকাটা’র করণে কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনের চাহিদা ২ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে। এইভাবে যদি সবাই কিনতে থাকে তাহলে দেশের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। মজুতদারি হবে এবং এক সময় ক্রেতাদের মজুতদারের দ্বারস্থ হয়ে বেশি দামে নিম্নমানের তেল কিনতে হবে।
এই ধারা রোধ করা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকার কিছু আপতকালীন ব্যবস্থা নিয়েছে। তার অংশ হিসেবে বিপিসি গত শুক্রবার ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়েছে। সে অনুযায়ী আজ রোববার থেকে বিপিসি প্রতিদিন ৯১৩ টন করে অকটেন সরবরাহ করবে যা গতবছরের এই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। গতকাল শনিবার পর্যন্ত দেশে অকটেনের মজুত ছিল ২৩ হাজার ৫৫ টন। প্রতিদিন ৯১৩ টন করে সরবরাহ করা হলে এই তেল দিয়ে ২৫ দিনের মতো চলা যাবে। এরপর সরবরাহ তো আছেই। পাশাপাশি দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া কনডেনসেট দিয়ে এ মাসেই ২৫ হাজার টন অকটেন তৈরি হবে। এছাড়া বিপিসি আরো ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির উত্স খুঁজছে। সব মিলে ৫০ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হলে তা দিয়ে চলা যাবে প্রায় দুই মাস।
অকটেন ব্যবহার করা হয় গাড়ি ও মোটরসাইকেলে। আবার পেট্রল দিয়েও এসব যানবাহন চলে। দেশে অকটেনের চাহিদার ৫০ শতাংশ এবং পেট্রলের চাহিদার পুরোটাই দেশে উত্পাদিত হয়। তাই পেট্রল ও অকটেন নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি। আদৌ হবে বলেও মনে হয় না।
গত অর্থবছরের হিসাবে দেশে পেট্রলের চাহিদা ৪ লাখ ৬২ হাজার টন। এর ১৬ শতাংশ এসেছে সরকারি শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে আর বাকি ৮৪ শতাংশ এসেছে ৪টি বেসরকারি শোধনাগার থেকে। চলতি বছরও বিপিসির পেট্রল আমদানির কোনো পরিকল্পনা নেই। দেশীয় উত্পাদন থেকেই চাহিদা মেটানো যাবে।
ইআরএল প্রতিবছর ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা পরিশোধনের মাধ্যমে পেট্রল, ডিজেল, ফার্নেসসহ বিভিন্ন জ্বালানি উত্পাদন করে। আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে এই অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে বর্তমানে আমদানি বন্ধ। তবে অপরিশোধিত তেল মজুত আছে দেড় লাখ টন। ইআরএলের শোধন সক্ষমতা প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার টন। কাজেই নতুন করে আমদানি না হলেও এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইআরএলে টানা উত্পাদন চলবে। এরপরও আমদানি বন্ধ থাকলে ইআরএলের উত্পাদন বিঘ্নিত হবে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী দেশে পেট্রলের দৈনিক গড় চাহিদা ১ হাজার ৩০০ টনের মতো। পেট্রলের মজুত আছে ১৫ হাজার ৫১৭ টন। আজ থেকে দিনে ১ হাজার ৭০ হাজার টন করে সরবরাহ করা হবে। এতে বর্তমান মজুত দিয়ে ১৫ দিন চলবে। তবে ইআরএল থেকে প্রতিদিন ৪০০ টন করে পেট্রল পাওয়া যাবে। বেসরকারি শোধনাগার থেকেও আসবে নিয়মিত। এ মাসে দেশের সরকারি-বেসরকারি শোধনাগার থেকে পেট্রল ও অকটেন মিলিয়ে ৪০ হাজার টন সরবরাহ আসতে পারে। তাই আপাতত মজুত শেষ হওয়ার আশঙ্কা নেই।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের চাহিদা ছিল ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এ হিসাবে দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার টনের আশপাশে। তবে আতংকিত কেনার কারনে গত কয়েকদিন দৈনিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টন। আজ থেকে দিনে ৯ হাজার ২২ লিটার করে ডিজেল সরবরাহ করা হবে। নতুন একটি জাহাজ আসার পর গতকাল পর্যন্ত ডিজেলের মজুত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮৬ টন। তা দিয়ে ১৮ দিন চলবে। ১৩ মার্চের মধ্যে ডিজেল নিয়ে আরও পাঁচটি জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা। ওই জাহাজগুলোতে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল আছে, যা দিয়ে আরও ১৫ দিন চলার কথা। এ ছাড়া দেশের সরকারি-বেসরকারি শোধনাগার থেকে এ মাসেই ৫০ হাজার টন ডিজেল পাওয়া যাবে। প্রতিবছর মোট ডিজেলের চাহিদার ১৮ শতাংশ আসে ইআরএল থেকে। অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বন্ধ থাকলে আগামী মাসে ডিজেল উত্পাদন কমার আশঙ্কা আছে।
দেশের জ্বালানি চাহিদার ৭০ শতাংশ ডিজেল। যুদ্ধ শুরুর পর ডিজেলের কয়েকটি জাহাজ আসা কয়েক দিন করে পিছিয়ে যায়। তাতে কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ১৪ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত আরও ১১টি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি জাহাজে ২ লাখ ৭০ হাজার টন ও বাকি দুটিতে ২০ হাজার টন ডিজেল আসার কথা। এসব জাহাজ আসার সময় এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি বিপিসি। এসব জাহাজ আসতে পারলে ডিজেলের সংকট হবে না।
সব মিলিয়ে গত অর্থবছর দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন।
সাতকাহন ডেস্ক