অনেক আশংকা উদ্বেগ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন ও গণভোট। যদিও সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক অনেক অভিযোগ ছিল বা রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত এবং এনসিপি নির্বাচনে প্রচুর অনিয়ম এবং নির্বাচনের পর পরাজিতদের ওপর হামলার অভিযোগ করছে। এমনকি জাময়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ‘বাধ্য করা হলে রাজপথে নামবেন’ বলেও হুমকি দিয়ে রেখেছেন। অবশ্য ওই দল দুটির বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ আছে। তবু একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সংসদ নির্বাচনে এমন বড় ধরণের কোনো সহিংসতা বা অনিয়মের ঘটনা কোথাও ঘটেনি যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে গণভোট অনেক বেশি প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। অন্তর্রবর্তী সরকার একটি পক্ষ হিসেবে গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে সর্বাত্মক অবস্থান নেওয়ার কথা বাদ দিলেও, গণভোটের ব্যালট পেপারে হ্যাঁ’র সামনে টিক চিহ্ন এবং না’র সামনে ক্রশ চিহ্ন দিয়ে দেওয়া কতটা আইনসম্মত সে প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। অনেকে এটাকে এক ধরণের জালিয়াতিও বলছেন। দ্বিতীয়ত গণভোটের পোষ্টাল ব্যালটে কোনো ক্রমিক নম্বর না দেওয়া কারচুপির কৌশল বলে মনে করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তৃতীয়ত সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি প্রথমিক ফলাফল প্রকাশ যখন প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে কথনও গণভোটের কোনো তথ্য প্রকাশিত হচ্ছিল না। শুক্রবার অপরাহ্নে নির্বাচন কমিশনের সনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সে তথ্য প্রকাশ করলেও তা কতটা সঠিক সে বিষয়ে মূলধারার গণমাধ্যমেও নানা বিশ্লেষণ চলছে। তাতে হিসাবে বড় ধরণের গড়মিলই বেরিয়ে আসছে।
আমরা আশা করতে পারি যে এই সব প্রশ্ন এবং নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো যে সব অভিযোগ তুলেছে আইন ও বিধিসম্মতভাবেই সেগুলোর নিস্পত্তি হবে এবং আমরা জনস্বার্থের বিষয়গুলোতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে পারবো। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ-অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহন, তাঁদের কাজকর্ম-সংস্কার, বিচার, জুলাই সনদ প্রণয়ণ, সর্বোপরি ত্রয়োদশ সংসদের নির্বাচন ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠান, এই সবকিছুই হয়েছে জাতীয়ভাবে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে। কিন্তু সেই এগিয়ে যাওয়ার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এর কিছু কিছু আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। আর কিছু নতুন করে গত দেড় বছরে সৃষ্টি হয়েছে। এর সবগুলোই মোকাবেলা করতে হবে নতুন সরকারকে এবং মোকাবেলা না করে এগিয়ে যাওয়ার উপায় নাই।
এবার নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে বিএনপি। আশা করা যায় দুই-একদিনের মধ্যেই নতুন সরকার শপথ গ্রহন করবে। এরপর শুরুতেই নতুন সরকারকে যে প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হবে তা হলো পবিত্র রমজান এবং বোরো মৌসুমে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। দেশে বিদ্যুতের উতপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কিছু বেশি থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকায় উতপাদন কম করতে হয়। আবার গ্যাসের ঘাটতি থাকায় তেলভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিল বাকি রাখায় ঐ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুত উতপাদনে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে ওই কেন্দ্রগুলোর বেশ কিছু বকেয়া পাওয়া পরিশোধ করলেও পরে যখন নির্বাচনের পথযাত্রা শুরু হয়ে যায় তখন থেকে বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। ফলে কেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানি তেল আমদানি অসম্ভব হয়ে পড়ে। রমজান এবং বোরো মৌসুমে এই কেন্দ্রগুলোই হবে বিদ্যুত পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার প্রধান ভরসাকেন্দ্র। অন্তর্বর্তী সরকার ৩২ নিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ গড়ে গড়ার সাফল্য দেখানো চেয়ে যদি এক বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কম রেখে এই দেনা-পাওনাগুলো পরিশোধ করতো তাহলে নতুন সরকারের জন্য সুবিধা হতো। নতুন সরকারকে এলএনজি আমদানিও অব্যাহত রাখতে হবে সর্বোচ্চ সক্ষমতায়। আর্থিক দিক দিয়ে সেটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় যে প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হবে তা হলো, গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন খাতের কয়েক হাজার শিল্প-কারখানা চালু করা। এগুলো বন্ধ হওয়ায় বেকার হয়ে পড়া কয়েক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের আর কোনো সহজ পথ নেই। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে অবশ্য বন্ধ কলকারখানা চালুর পদক্ষেপ গ্রহন এবং রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তাই এই কাজটি অগ্রাধিকার পাবে বলেই ধারণা করা যায়।
তৃতীয় যে প্রতিবন্ধকতাটি মোকাবেলা করতে হবে তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায়ভার। অর্থনৈতিক দায়ভারের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এবং পর্যায়ক্রমে বিমান প্রভৃতি কেনা। আর যে বিষয়টি এই বিষয়টি এই চুক্তিতে রয়েছে-যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন ধরণের কৃষিপণ্য আমদানি এবং সেগুলোকে বিশেষ শুল্কসুবিধা দেওয়া, এর যেমন আর্থিক দায়ভার রয়েছে তেমনি রয়েছে সামাকিত দায়ভারও। কারণ এর ফলে দেশের কৃষকদের উতপাদিত পন্যসামগ্রী বাড়তি প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটবে। দেশে কৃষিজাত পন্যের দাম বাড়বে। সেই বাড়তি দামের বোঝা বহন করতে হবে সর্বসাধারণকে যাদের মধ্যে নিম্ন-মধ্য ও সীমিত আয়ের মানুষের সংখ্যা অনেক।
চতুর্থ বিষয়টি হলো-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তির শর্ত হিসেবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত করতে হবে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি অংশ ডিপি ওয়ার্ল্ড নামক একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে এনেছিল সে বিষয়েও নতুন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পঞ্চম বিষয় হলো-অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদের একেবারে শেষে এসে তড়িঘড়ি করে সাড়ে ১৪ লাখ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু তাঁদের বেতন-ভাতার কোনো সংস্থান করেনি। এই কাজটিও নতুন সরকারকে করতে হবে। একইভাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য যে প্রে-স্কেল চূড়ান্ত করে রেখে গেছে তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও পড়বে নতুন সরকারের ওপর। এগুলোর আর্থিক দায় হবে বিপুল পরিমান। অথচ সরকারের অর্থসংকট প্রকট। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খেলাপি ঋণ উসুল হওয়ার পরিবর্তে তা পরিমান আরো বিপুল পরিমান বেড়েছে। শুধু তাই নয়, এই সময়ে সরকারি ঋণের পরিমানও বেড়েছে বিপুল পরিমানে।
সিনিয়র সাংবাদিক
অরুণ কর্মকার