Satkahonbd | সাতকাহন
সত্যের সন্ধানে

বিদ্যুত্‌ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য স্পষ্ট করা দরকার

বিদ্যুত্‌, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার প্রতিদিন জ্বালানি তেলে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য এক ধরণের গণবিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট অনেকে এই তথ্য সঠিক নয় বলেও মনে করছেন। কেন?

প্রথমত, দেশে এখন পর্যন্ত যে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং বিপণন পাইপলাইনে আছে তার সবই কেনা হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন, ২৮ ফেব্রুয়ারিও ক্রুড অয়েলের দাম (ব্রেন্ট ক্রড) ছিল প্রতি ব্যারেল ৬৭ দশমিক ০২ ডলার। এর আগে, গত বছরের ডিসেম্বর ও এ বছরের জানুয়ারিতে এই দাম ছিল ৬০ ডলারের নিচে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকার নির্ধারিত যে দামে বর্তমানে সব ধরণের জ্বালানি তেল বিক্রি করছে তাতে প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলার পর্‌যন্ত দাম হলেও লোকসান হয় না। এই কারণেই বিপিসি গত তিন বছরে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি মুনাফা করতে পেরেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে বিপিসি মুনাফা করেছে ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে করেছে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি এবং ২০২৩ সালে মুনাফা করেছে ২ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। কারণ এই সময়ে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম কখনোই ৭৫ ডলারের বেশি হয়নি।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক দামবৃদ্ধি শুরু হয়েছে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুরও কয়েকদিন পর থেকে। গত ১০ মার্চও প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৮৩ দশমিক ৪৫ ডলার। গত ১৪ মার্চ দাম আরেকটু বেড়ে হয় ব্যারেল প্রতি ৯৮ দশমিক ৭১ ডলার। আজ ২৭ মার্চ প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১০ দশমিক ৬৯ ডলার। এই দাম বৃদ্ধির ঘটনা যদি আমরা ২০ দিনও ধরি তাহলেও বিপিসির লোকসান কিংবা সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। কারণ এই ২০ দিনে আমরা নুতন করে কোনো তেল কিনলেও তা এখন পর্‌যন্ত দেশে আসেনি বা বিপণন পাইপলাইনেও ঢোকেনি। তাহলে কীভাবে সরকার জ্বালানি তেলে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে! বরং বলা যায়, যেহেতু আগের কেনা তেল আগের দামেই বিক্রি করা হচ্ছে সেহেতু এখনো বিপিসি মুনাফাই করছে।

তৃতীয়ত, হ্যাঁ, যুদ্ধকালীন সময়ে জাহাজ ভাড়া অনেকটাই বেড়েছে। বীমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়াও স্বাভাবিক। যদিও আগের কেনা জ্বালানি তেল পরিবহনে এসব ব্যয় পূর্বনির্ধারিত হারেই হওয়ার কথা। তারপরও ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি হিসাবে নিলেও বিপিসির বিপুল পরিমান লোকসান হওয়ার কোনো কার নেই। আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তা হলো, যুদাধকালীন সময়ে বিভিন্ন দেশ এবং খোলা বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে অনেক বেশি দামে কয়েক জাহাজ এলএনজি কেনা হয়েছে। এক্ষেত্রেও হিসাবটি একই রকম। ওই এলএনজি এখনো দেশে ব্যবহৃত হয়নি। এমনকি সবগুলো হাজাজ এখন পর্‌যন্ত দেশে পৌঁছেওনি। সুতরাং সেই কারনেও সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া বা ভর্তুকির প্রশ্ন ওঠেনা।

সর্বোপরি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল কেনা-বেচায় দাম নির্ধারণের যে পদ্ধতি তাতে আজ দাম বাড়লে আজই যদি তেল কেনা হয় ততেও কেনা তেলের দাম আর বর্ধিত দাম সমান হয় না। কারণ সিঙ্গাপুরভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘প্লাটস’-এ প্রতিদিন তেলের একটি নির্ধরিত দাম প্রকাশিত হয় যাকে বলা হয় ‘প্লাটস রেট’। এই প্লাটস রেট অনুযায়ী আজ তেল কিনলেও দাম নির্ধারিত হবে ওই তেল জাহাজে তোলার দিনের দামের সঙ্গে এর আগের দুদিন এবং পরের দুদিনের দাম গড় করে যে দাম পাওয়া যাবে তা। সুতরাং তেলের দাম বাড়লেই যে সবক্ষেত্রে সমানভাবে দাম বেশি পড়ে যায় তা নয়।

প্রতিমন্ত্রী যখন বলেছেন প্রতিদিন সরকারের ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার কথা তখন ধরে নেওয়া যায় যে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো কর্মকর্তা হিসাবটি তাঁকে জানিয়েছেন। কিন্তু সেটি কীভাবে, সেই বিষয়টি প্রতিমন্ত্রী তথা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা দরকার যাতে এ নিয়ে গণবিভ্রান্তির অবসান ঘটে।

বিশেষ প্রতিনিধি

সাতকাহন

You might also like