অসাধারণ! এখনও মানসপটে জ্বলজ্বল করছে সেই ছিয়াত্তর-সাতাত্তুরের উথাল পাথাল ফুটবলের একটি বিকেলের দৃশ্যপট। তখন আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল মানেই নির্ঘাত মারামারি, স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ, হঠাৎ লেগে গেলো ধুন্দুমার লাঠালাঠি, দু’পক্ষের মধ্যে। আর কি দেরী করা যায়, সোজা ভৌ দৌড়, একছুটে স্টেডিয়াম থেকে গোপীবাগ, তারপর স্বস্তি। ইত্তেফাকের মোড়ে পৌঁছেই জটলা পাকানো, একজন খানিকটা দম নিয়ে শুরু করে দিল-
“থাকিতে চরণ মরণে কী ভয়,
নিমেষে যোজন ফরসা।
মরণ-হরণ নিখিল-শরণ
জয় শ্রীচরণ ভরসা॥”
এটাই তো আমাদের দূরন্তকালের নজরুল, যদিও তাঁর বিখ্যাত একটি স্যাটায়ার, তবুও প্রথম সুযোগেই মুখ থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে এরকম চরণ- “জয় শ্রীচরণ ভরসা”। ছিয়ানব্বুই বছর আগের একটি দূর্দান্ত সৃষ্টি, এখনও নাড়া দেয় সময়ে অসময়ে আমাদেরকে, যখনই প্রয়োজনে বিবেকের সাড়া না দিয়ে পিছু হটার আভাস সবার মাঝে উঁকি দেয়, ঠিক তখনই নজরুলের বিদ্রুপের কলম হেসে উঠে, “ছুটি যবে মোরা–সুমুখেই ছুটি,/ পশ্চাতে পাশে হেরি না!/ সামনে ছোটারে পিছু হাঁটা বল?/ রাঁচি যাও, আর দেরি না॥”
এটি আসলে কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত স্যাটায়ার গান। সোহিনী রাগে এবং একতাল লয়ে নিবদ্ধ গানটিতে বৃটিশদের দমন-পীড়নের মুখে পলায়নপর মনোবৃত্তিকে বিদ্রূপ করেছেন তিনি। শব্দ-খেলায় ব্যঙ্গের ছলে নজরুল এখানে পলায়নের ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষদের মিলিত হওয়ার ঈঙ্গিতে সমাজের ভীরুতাকে আক্রমণ করেছেন- “লখিতে চকিতে লঙ্ঘিয়া যায়/ গিরি দরি বন সিন্ধু,/ এই এক পথে মিলিয়াছি মোরা,/ সম মুসলিম হিন্দু॥” [চন্দ্রবিন্দু]
সাঙ্গীতিক দৃষ্টিকোণে আমরা জানি যে, সাধারণত সোহিনী রাগ একটি করুণ ও ধীর প্রকৃতির রাগ, অথচ নজরুল তাঁর সৃষ্টিশীলতায় এই রাগের গম্ভীর সুরের সাথে চপল রসের চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এমনটি তিনি আরও করেছেন, যেমন সোহিনী-বসন্ত রাগে কাহারবা তালে ‘ছিটাইয়া ঝাল নুন এলো ফাল্গুন মাস/কাঁচা বুকে ধরে ঘুণ, শ্বাস ওঠে ফোঁস ফাস” গানটিতে বসন্তের বিরহকে অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেছেন। অমনই আরেকটি তাঁর বিখ্যাত গান “রাধা-বল্লভী লোভে পূজি রাধা-বল্লভে,/’রস-গোল্লার লাগি’ আসি রাস মোচ্ছবে!” প্রকৃতপক্ষে, শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠিন নিয়ম মেনেও কীভাবে নতুনত্ব আনতে হয় তা হাসির গানেও প্রমাণ করেছেন।
একথা সর্বজনবিদিত যে, বিভিন্ন রাগ-রাগিণী ও সুর-তালের ব্যবহারে নজরুল আধুনিক বাংলা গানকে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন, তাই হাজার বছরের বাংলা গানের ইতিহাসে নজরুল এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর গান একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় বাংলার বিষয় ও সুরের ধারাকে অবলম্বন করেছে, অপরদিকে তেমনি উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীত ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরী, টপ্পা ও গজলকে আঙ্গিক ও সুরের ভিত্তি করেছে।
কত বৈচিত্র্যময় ছিল নজরুলের সমগ্র জীবন। ১৯০৮ সালে তাঁর বয়স যখন সবে ৯ বছর, তখন বাবাকে হারান। আর্থিক অনটনে একটানা পড়াশোনা করা তাঁর হয়ে ওঠে নি। সংসার চালানোর জন্য মক্তব পাশ করে সেখানেই কাজ শুরু করলেন চুরুলিয়ার ‘দুখু মিঞা’। কিন্তু মক্তবের ওই সামান্য আয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টসাধ্য ছিল। শৈশবে পিতৃহারা দুখু মিয়াকে শৃঙ্খলিত করতে পারেনি নিয়মের বেড়াজাল। জীবিকার অন্বেষণে ছুটে বেরিয়েছেন। বৃটিশ-ভারতের মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় তাঁর বই বাজেয়াপ্ত হয়েছে, পীড়ন সহ্য করেছেন, কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। আশ্চর্য হতে হয়, জীবনযুদ্ধে আজীবন লিপ্ত থেকেও সাহিত্য ও সংগীতের এত গভীর জ্ঞান কিভাবে তিনি অর্জন করলেন। যতদূর জানা যায়, সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল এর কাছে গানের তালিম নেন নজরুল, তাঁর বাড়ি গিয়ে গলা সাধেন। হুগলীর ঘুটিয়া বাজারের হাবিলদার নিত্যানন্দ দে তাঁকে অর্গান বাজনা শিখিয়েছিলেন। আরেকজন শিক্ষক হাফিজ নুরুন্নবী সাহেব। রুচিবান, পরিশীলিত, মার্জিত স্বভাবের মানুষটির কাছে নজরুল শিখলেন ফার্সি ভাষা। শিয়ারসোল স্কুলের মাস্টারমশাই নিবারণচন্দ্র ঘটক বিপ্লবী, তাঁর সাহচর্যে নজরুলের মাঝেও ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে দেশাত্মবোধের গভীর ধারণা।
আমরা দেখছি যে, নজরুলের কলম সক্রিয় ছিল সব মিলিয়ে মাত্র তেইশ বছরের মত। তারপর তো তিনি অসুস্থ-ই হয়ে পড়লেন। এই স্বল্পকালীন লিখালিখির জীবনে কবিতা-উপন্যাস-গল্প-নাটক-প্রবন্ধ সবখানেই তাঁর প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়েছেন। চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা ও অভিনয় করেছেন। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহী কবি বা রোমান্টিক সংগীত রচয়িতাই ছিলেন না, হাস্যরসাত্মক বা কমিক গান রচনায় তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তাঁর রচিত হাসির গানগুলোতে সামাজিক অসংগতি, ভণ্ডামি ও দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যঙ্গচিত্র ফুটে উঠেছে।
নজরুলের প্রকৃত গানের সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও, বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংখ্যাটি হলো ৩,১১৭টি। বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সংকলন ও গবেষণার পর এইচএমভি এবং নজরুল ইন্সটিটিউট এই সংখ্যাটি নিশ্চিত করেছে। তবে অনেকে মনে করেন যে, তাঁর অনেক গান হারিয়ে গেছে বা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে মোট গানের সংখ্যা অবশ্যই ৪,০০০-এর বেশি হবে।
প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে নজরুলের গানগুলোকে সংখ্যাভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস করলে মোটামুটিভাবে এরকম একটি চিত্র পাওয়া যায় (যদিও তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে) : প্রায় ১,৬০০টি ইসলামী ও সনাতনী ভক্তিগীতি; প্রায় ৮০০টি প্রেম ও বিরহের গজল; রাগপ্রধান প্রায় ৩০০টি;প্রায় ৪০০টি প্রকৃতি ও দেশাত্মবোধক;অন্যান্য। আবার সংগ্রহের দৃষ্টিকোণে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি- নজরুল ইনস্টিটিউট (ঢাকা) ৩,১০০/৩,১৬৩টি;ব্রহ্মমোহন ঠাকুর ২,৬৯৮টি; করুণাময় গোস্বামী ২,৮৯৯টি গান;কল্পতরু সেনগুপ্ত: ৩০৯২টি; আবদুল আজিজ আল আমানের সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত নজরুলগীতি অখন্ড (সেপ্টেম্বর ১৯৭৮) ২১১১টি; আবদুস সাত্তারের নজরুল সঙ্গীত অভিধানে ৩০৮৬টি গান; রফিকুল ইসলামের সম্পাদনায় তিনটি খন্ড গীতি সংকলন ইত্যাদি।
দারিদ্রের মাঝেও তিনি সবসময়ই আনন্দে থাকতে চাইতেন। ১৯২৩ সাল, তখন হুগলী জেলে বন্দী তিনি। জেল সুপারকে উদ্দেশ্যে করেই কবি লিখলেন এই “তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে তুমি ধন্য ধন্য হে” গানটি। এটি মূলতঃ রবীন্দ্রনাথের ‘তোমারই গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে’ এই গানটির প্যারডি। জেলসুপার আর্সটন পরিদর্শনে এলে বন্দীরা এক সঙ্গে গানটি গেয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাত। [ভাঙার গান ১৯২৪]
নজরুলের রসবোধ ও তাৎক্ষণিক প্যারোডি বা অনুকরণ সৃষ্টির ক্ষমতা সত্যিই অনবদ্য ছিল। ১৯৪১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মিউজিক্যাল কমেডি ছবি “দ্যাট নাইট ইন রিও”-তে ব্রাজিলীয় কারমেন মিরান্ডা তাঁর বিখ্যাত “চিক চিক বুম চিক” গানটি গেয়ে বিশ্বজুড়ে দারুণ আলোড়ন তোলেন। হলিউডের এই জনপ্রিয় গানের সুর ও ছন্দকে চমৎকারভাবে কাজে লাগিয়েই কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কালজয়ী গানটি তৈরি করেছিলেন- “চামচিকা চামচিকা চামচিকা,/ ওরে চামচিকা,/ ভয়েতে বুক কাঁপে ধুকধুক/ ওরে চামচিকা!”
তাঁর প্রতিভার ছটা এতই অসামান্য ছিল যে, প্রতিটি সৃষ্টিতেই তা পলে পলে অনুভব করা যায়। যদিও বর্তমান লেখাটিতে শুধুই তাঁর স্যাটায়ার নিয়েই অধিকতর আলোকপাত করার প্রয়াস নেয়া হয়ছে, তবুও কয়েকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়ে যাবে।
নজরুলের সেই “রমজানের এই রোজার শেষে” এখন তো প্রতিটি ঘরের নিজস্ব একটি গানে পরিণত হয়ে গেছে। ১৯৩১ সালে বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের অনুরোধে এই গানটি তিনি পিলু রাগে কাহারবা তালের উপর বেঁধেছেন। প্রয়োজনের নিরিখে বেশ কয়েকটি মুসলিম ঐতিহ্যবাহী আরবি ও ফারসি শব্দ সফলভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি গানটিকে একটি অনন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। আবার এই একই নজরুল যখন ভূপালী রাগে দাদড়া তালে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির গানে উচ্চারণ করেন “ভক্তি আমার ধূমের মত/উর্দ্ধে ওঠে অবিরত,/শিব–লোকের দেব–দেউলে মা’র শ্রীচরণ পরশিতে’’ তখন তিনি হয়ে যান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্ত্বা। [শিল্পী- গিরীন চক্রবর্তী, এইচএমভি, ১৯৩৮ জুলাই]
লঘু বাংলা গান থেকে গুরুগম্ভীর ধ্রুপদ পর্যন্ত বাংলা গানের হেন শাখা নেই যাতে তিনি গান রচনা করেননি। বৈচিত্র্য ও বিপুলতা এ দুইই নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভার অনন্যতার স্বাক্ষর বহন করে। প্রকৃতপক্ষে নজরুল ছিলেন নানান ভাবধারার সঙ্গম। অবহেলিত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সুর, এমনকি ঝুমুর,জারী,ভাটিয়ালী,কীর্তন এগুলোর সুরকে নজরুল নিজের মত করে টেনে আনেন সংগীতের আসরে। তাই দেখি, নজরুলের সামাজিক রাজনৈতিক ব্যঙ্গ কবিতা-গানে লোকজ সংস্কৃতির ছাপ অতি স্পষ্ট। উটের পিঠে চলার যে গতি সেই গতির মাঝে দোল খাওয়ার নিজস্ব একটি ছন্দ রয়ে গেছে, সেটি আরবী-ফারসীতে ‘মোতাকারিব’ ছন্দ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। নজরুলের সৃজনশীলতায় বাংলার জল-ভরণী বঁধুর রণনে ফুটে উঠেছে সেই ‘মোতাকারিব’ ছন্দ, আবার আমরা দেখছি গাছের শুকনো পাতার মাঝে তিনি খুঁজে বের করেছেন নূপুরের ছন্দ এবং তাতে আশ্চর্যজনকভাবে প্রয়োগ করেছেন আরবী লোক-সংগীতের সুর।
তাঁর হাতেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে পড়েছে আমাদের গানে গজলের প্রেম-বিরহসিক্ত মূর্ছনা এবং গীত-ঢং। কত পরম মমতায় তিনি সৃষ্টি করে গেছেন, অথচ জীবদ্দশায় নিজের গানের সুর বিকৃত করে গাওয়ার প্রবণতা দেখে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হৃদয়ে ১৯২৯ সালের ২৩ আগস্ট সেই সময়ের জনপ্রিয় ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে বেতার ও বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর গানের সুর-বিকৃতির তীব্র সমালোচনা করে তিনি লিখেছিলেন,”একদিন শুনলাম কোনো একজন আমার ঠুমরী চালের দুর্গা সুরের ‘নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখিজল’ গানটিকে ধ্রুপদের ইমন সুরে গাইছেন এবং তা শুনে আমার গানের আঁখিজল আমার চোখে দেখা দিল। অবশ্য অনুরাগে নয়, রাগে এবং দুঃখে।”
বৈষ্ণবভক্তরা রাধাকৃষ্ণের লীলার ‘সুর-চিত্র’ দর্শনের দুর্লভ সুযোগ লাভ করেন নজরুলের সৃষ্টিতে। একজন শাক্ত নজরুলের শ্যামাসঙ্গীতের সুরে শ্যামামায়ের চরণে একটি রাঙা জবা নিবেদন করেন; প্রতিটি মুসলমান ঈদের বাঁকা চাঁদ দেখার আনন্দে আত্মহারা হন নজরুল এর সৃষ্টিতেই; যুবক থেকে বৃদ্ধ সকলেই প্রেম ও শোকের মাঝে নজরুলের গানে বুঁদ হয়ে থাকেন। নিপীড়িত জনগণের অন্তর মথিত বাণী হয়ে যায় তাঁর দেশাত্মবোধক গান। কি নেই তাঁর সৃষ্টিতে- যেমন লিখেছেন ভজন, কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, তেমনি লিখেছেন ইসলামি ভক্তিমূলক গান, জারি, সারি, মুর্শিদি মারফতি।
যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেই হাসির গান নিয়েই যদি থাকি তবে আমরা দেখবো যে, তাঁর সংগীতের গ্রন্থগুলো থেকে দুশো’রও বেশী হাসির গানের সন্ধান মেলে। এর সবগুলোই আমাদের বাংলা সাহিত্য ও গানের জন্য অতি মূল্যবান সম্পদ। এগুলোর কোনটাকে বিবেচনা করা হয় নিছক হাসির গান হিসেবে, যেমন- উনিশ শ’ তেত্রিশ সালে এইচ এম ভি থেকে ‘শিশুমঙ্গল সমিতি’ কর্তৃক গীত “আমি যদি বাবা হতুম বাবা হ’ত খোকা/না হলে তার নামতা পড়া মারতাম মাথায় টোকা” [পুতুলের বিয়ে মার্চ, ১৯৩৪]। শক্ত ছন্দের সাথে হালকা শব্দবন্ধের প্রচলিত গাঁথুনিতে এ গানগুলো শুধু গাইবার বেলায় নয়, সুখপাঠ্য হিসেবেও অতুলনীয়। অত্যন্ত উচ্চ অনাবিল আনন্দের সুখশ্রব্য হলেও তাঁর অন্যান্য পর্যায়ের গানের তুলনায় হাসির গানের প্রচার খানিকটা পিছিয়ে আছে। অনেকে মনে করেন রঞ্জিত রায়, হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল গুপ্ত প্রমুখ নজরুল সান্নিধ্যধন্য প্রতিভাবান গায়কের কল্যাণে যে হাসির গান বাঙালি শ্রোতাদের আনন্দ দিয়েছিল, তা গাওয়ার অভাবে তাঁর অন্যান্য গানের তুলনায় আজ পিছিয়ে পড়ছে।
নজরুলের বাল্যকালে লেখা অনেক ‘লেটো গান’-র মধ্যেও হাস্যরসের উপাদানের ছড়াছড়ি। কখনও কখনও বাংলা শব্দের সাথে ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে কমিক নকশা তৈরি করেছেন নজরুল। এ পর্যায়ের একটি গান “রব না কৈলাশপুরে আই য়্যাম ক্যালকাটা গোয়িং/যত সব ইংলিশ ফ্যাশান আহা মরি কি লাইটনিং” [এইচএমভি থেকে ১৯৩৭ সালের আদি রেকর্ডে গানটি গেয়েছিলেন শিল্পী প্রমোদা]।
সমকালীন সমাজ নিয়ে নজরুল নির্বিঘ্নে হাস্যরস করেছেন, যেমন- “টিকি আর টুপীতে লেগেছে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ ঘোর/কে বড় কে ছোট চাই মীমাংসা কার আছে কর”-।[ এইচ এম ভি, অক্টোবর ১৯৩৫ শিল্পী বিমল দাশগুপ্ত]
আমাদের সামাজিক সম্পর্ক নিয়েও নিছক হাস্যরসের গান লিখেছেন নজরুল ইসলাম। যেমন-“গিন্নির চেয়ে শালী ভালো মেসোর চেয়ে মামা/আর ডাইনের চেয়ে ডুগী ভালো অর্থাৎ কিনা বামা।।”[শিল্পী হরিদাস বন্দোপাধ্যায়, টুইন কোম্পানী, ১৯৩৩]
তাঁর পক্ষেই সম্ভব অমন মুন্সিয়ানায় কীর্তনাঙ্গের সুরের নির্মল হাসির অনবদ্য অমন গান সৃষ্টি করা- “আমার হরিনামে রুচি, কারণ, পরিণামে লুচি/আমি ভোজনের লাগি করি ভজন/আমি মালপোর লোভে এ কল্পলোকে তল্পী বাঁধিয়া এসেছি মন/‘রাধা-বল্লভী’ লোভে পূজি রাধা-বল্লভে/আসি রসগোল্লার তরে রাস মোচ্ছবে/আমার গোল্লায় গেছে মন, দাদা গো/রসগোল্লায় গেছে মন।” [সুরসাকী-১৯৩২]
নজরুল নিজেই তাঁর বিখ্যাত ইসলামী গান “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”এর সুর অবলম্বনে রচনা করেন আরেকটি বিখ্যাত হাসির গান-“ওরে হুলোরে তুই রাত বিরেতে/ঢুকিসনে হেঁসেল্/তুই কবে বেঘোরে প্রাণ হারাবি/বুঝিসনে রাস্কেল” [ ১৯৩২ সালের নভেম্বর মাসে ‘টুইন রেকর্ড কোম্পানি’, শিল্পী হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-‘গীতি-শতদল’ কাব্যগ্রন্থভুক্ত]
তিনি যে শুধু সাংগীতিক কাঠামো, স্থায়ী-অন্তরা-সঞ্চারী-আভোগ, মেনেই হাসির গান লিখেছেন, তা নয় তাঁর দীর্ঘ পালাপ্রধান গানেও হাস্যরসের উপাদান রয়েছে, যেমন ‘কবির লড়াই’ পালায় কবিয়ালকে প্রম্পটার যখন আসল খাতার বদলে ধানের হিসেবের খাতা থেকে পাঠ করে শোনাচ্ছিল, তখন কবিয়াল প্রম্পটারের ভুল ধরে ফেলে বলছে – “ওরে না রে না, ওরে না রে না,/কয়ালি কী কওয়ালি, অ্যা?/ধানের খাতার হিসেব ব’লে/কুল-মান মোর সব খোয়ালি?”[প্রথম রেকর্ড ১৯৪০ টুইন রেকর্ড কোম্পানি]
আজীবন দুঃখের সাগরে ভাসলেও তিনি সবসময়ই আনন্দের মাঝে থাকতে চাইতেন। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, “–কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি রঙিন জামা পরেন কেন? ‘সভায় অনেক লোকের মধ্যে যাতে চট করে চোখে পড়ে তাই’, বলে ভাঙা ভাঙা গলায় হো হো করে হেসে উঠেছেন তিনি। কথার চেয়ে বেশী তার হাসি, হাসির চেয়ে বেশী তার গান। একটি হারমোনিয়াম এবং যথেষ্ট পরিমাণ চা এবং অনেকগুলো পান দিয়ে বসিয়ে দিতে পারলে সব ভুলে পাঁচ-ছয়-সাত ঘণ্টা একনাগাড়ে গান করতে থাকতেন। নজরুল যে ঘরে আড্ডা জমাতেন, সে ঘরে আর কেউ ঘড়ির দিকে তাকাতো না।”[কালের পুতুল, ১৯৪৬]
একবার নজরুল গেছেন সিরাজগঞ্জে, আসাদউদ্দৌলা সিরাজীর বাসায়। খাওয়া দাওয়ার পর সবাইকে দই দেয়া হলো। দই বেশী টক লাগাতে, মুখে দিয়েই গৃহকর্তার দিকে তাকিয়ে চোখে-মুখে অদ্ভূত ভঙ্গি করে তিনি বললেন- ‘তুমি কি এই দই তেঁতুল গাছ থেকে পেড়ে নিয়ে এলে নাকি?’ আর তা শুনে সবাই আর হাসি থামাতে পারছিলনা।
উনিশ শ’ বত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ সালের দিকে কবি নজরুল তখন খুব ব্যস্ত। একবার গ্রামোফোন কোম্পানীতে প্রফেসর জি দাস নামে কাটোয়ার এক ভদ্রলোক এসে ধরলেন, গান গাইবেন। কিন্তু তাঁর গান কিচ্ছুই হচ্ছিল না, কিন্তু তিনি কেঁদে-কেটে নাছোড়বান্দা। কবি তাঁর জন্য গান লিখলেন, প্রফেসরকে বললেন যে এই গানের কথা যেন কেউ জানতে না পারে, যখন গান বাজারে আসবে তখনই শোনা যাবে প্রথম। সেই ভদ্রলোককে দিয়ে তিনি গাওয়ালেন “–কলা গাড়ি যায়, ভষড় ভষড়/ ছ্যাকরা গাড়ি যায় খচাং খচ/ ইচিং বিচিং জামাই চিচিং/ কুলকুচি দেয় করে ফচ…”। সেখানে উপস্থিত বাকি দুজন তো কবির কান্ড দেখে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। পরের দিন এর আরেকখানা লিখে আনলেন কবি,অপর পিঠে রেকর্ড করালেন–‘মরি হায় হায় হায়, কুব্জার কী রুপের বাহার দেখো।/ তারে চিৎ করলে হয় যে ডোঙা/ উপুড় করলে হয় সাঁকো।/ হরি ঘোষের চার নম্বর খুঁটো, মরি হায় হায় হায়…’
এ গানে প্রফেসরকে যে চতুষ্পদ বানানো হচ্ছে, তাও কেউই টের পেল না। খুব উৎসাহে প্রফেসর রিহার্সাল করতে থাকলেন। রেকর্ড প্রকাশিত হওয়ার দু’ একদিন পর খোঁজ নিয়ে দেখা গেল যে, ক্রেতারা দেদারসে কিনছে আর গাইছে, “কলা গাড়ি যায় ভষড় ভষড়”। সব শুনে জোরে হাসিতে ফেটে পড়লেন কাজী নজরুল ইসলাম।
আমাদের রসিক নজরুল। একবার এক ভদ্রমহিলা নজরুলের পান খাওয়া দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা আপনি কি পানাসক্ত?” নজরুল বললেন, “জ্বি না, আমি বেশ্যাসক্ত!” নজরুলের এমন উত্তর শুনে ভদ্রমহিলার মুখ কালো হয়ে গেল। পরে নজরুল ব্যাখ্যা করলেন, “পান একটু বেশি খাই তাই বেশ্যাসক্ত, অর্থাৎ বেশি+আসক্ত=বেশ্যাসক্ত!” [হিরণ্ময় ভট্টাচার্য, ‘রসিক নজরুল’]
শুধু তাই নয়, বেহাগ মিশ্র রাগে এবং দাদরা তালের ছকে ফেলে নিজের হাস্যরসপূর্ণ চরিত্রকে নজরুল নিজেই তুলে ধরেছেন একটি হাসির গানে- যা হরিদাস বন্দোপাধ্যায়ের কন্ঠে ১৯৩২ সালের জুন মাসে টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রথম রেকর্ড আকারে প্রকাশিত হয়-“আমি দেখব হাসি/আমায় দেখলে পরে হাসতে হাসতে পেয়ে যাবে কাশি/ আমি হাসির হাঁসলী ফেরি করি এলে আমার হাসির দেশে/বুড়োরা সব ছোঁড়া হয়, আর ছোঁড়ারা যায় টেঁসে/আমার হাস-খালিতে বাড়ি, আমি হাসু-হানার মাসি।” [‘সুর-সাকী’, ১৯৩২]
লেখক, গবেষক এবং লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তীর একটি লেখা থেকে কয়েকটি লাইন এখানে তুলে দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না- “– বরং অনেক বেশী সাড়া ফেলেছিল নজরুলের গান। তাঁর বিপুল জনাদর আর মজলিশি স্বভাব। বাড়ীতে চা-কফি-পান নিয়ে জম্পেশ আসর বসত তাঁর। আসতেন গান পাগল বেশ ক’জন। তারিফদারি করতেন। গাইতেন কাজীর গান। সেই সব গানের রসিক, যথা কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্ত, গিরীন চক্রবর্তী বা চিত্ত রায়- কেউ সুর করতেন, কেউ গাইতেন, তবে কেউই উঁচুদরের পারফর্মার ছিলেন না। অথচ নজরুল ছিলেন বিচিত্রস্বভাবী, খামখেয়ালী আর তাৎক্ষণিক সংগীত সৃজনে সদা তৎপর। যে কোন বিষয়ে যখন তখন গান রচনা করে যৎতৎক্ষনাৎ সুর দিয়ে তা অনায়াসে গাইতেন। তবে বেশী উৎসাহ ছিল অন্যের কন্ঠে গান তুলিয়ে দিয়ে গাওয়ানোর। টাকা পয়সার টানাটানি বরাবর বিপন্ন করত তাঁর সংসারকে। গানই ছিল তাঁর রোজগারের পথ। তাই থিয়েটারে, ফিল্মে, রেকর্ডে ও বেতারে কেবলই গান দিতেন। অখ্যাত কত গায়ক গায়িকাকে খুঁজে-পেতে এনে বিখ্যাত করতেন। এমনকি মানহীন অজ্ঞাত অনেক গায়িকাকে অবিদ্যাপাড়া থেকে সংগ্রহ করে এনে রেকর্ড কোম্পানীতে শামিল করতেন। তিনি ছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানীর বেতনধারী ট্রেনার। তাই গান বানিয়ে তা শিখিয়ে, যন্ত্রানুসঙ্গ সহ সরাসরি ট্রেনিং দিয়ে, সটান স্টুডিওতে পৌঁছে গান রেকর্ড করিয়ে তবে চুক্তি শেষ হত। এভাবেই আঙুরবালা, ইন্দুবালা, কমলা ঝরিয়াকে তিনি আবিষ্কার করে প্রতিষ্ঠা দেন, বিখ্যাত করেন।” [একই গানের আকাশে যুগ্ম কিন্নর, দেশ, ১৭-৭-২০১৯]
এই হলো আমাদের নজরুল, সৃজনশীলতার মাঝে গভীর ডুব দিতেন আবার মুহুর্তেই রসিকতায় সকলকে মুগ্ধ করে দিতে পারতেন। ভুলে যেতে চাইতেন নিজের কষ্টকর জীবনের কথা, সকলের সাথে মিশে আনন্দেই কাটাতে চাইতেন। আনন্দময়তাই ছিল তাঁর অমূল্য সৃষ্টিগুলোর উৎস, সমাজকে সম্প্রীতির শক্তিতে জাগিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি।
আবার দেখছি, মাতৃবন্দনায় অতুলনীয় নজরুল ক্ষণে ক্ষণে আমাদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যান। কবিতায় ও গানে আমাদের জননীকে কেবল একজন জন্মদাত্রী হিসেবেই নয়, এই যে একটি মাতৃরূপিণী সত্ত্বা এবং আমাদের সর্বোচ্চ আশ্রয়স্থল তা নজরুল সবসময়ই কত সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন। তাঁর বিখ্যাত শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিঙেফুল’-এ কী সুন্দর করে লিখেছেন তিনি-“যেখানেতে দেখি যাহা মা-এর মতন আহা/একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,/মায়ের মতন এত আদর সোহাগ কোথা/আর কোনোদিন কেহ তো দিতে পারে নাই।” [ঝিঙেফুল, সেপ্টেম্বর ১৯২৬[
আবার ফিরে আসছে কৈশোরের স্মৃতি, সেই তিয়াত্তুর সালের। গোপীবাগ রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে আমাদের এক বন্ধু যখন কৈশোরের মিহি মিহি কন্ঠে আবৃত্তি করতো- “অ-মা! তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং?/খাঁদা নাকে নাচছে ন্যাদা-নাক ডেঙাডেং-ড্যাং।”, এটুকু শুনেই আমরা হেসে গড়াগড়ি খেতাম, সেই কবেকার শোনা- এখনও যে পুরোটাই মুখস্থ রয়ে গেছে।
আজকে হয়তোবা মা-কে আবার কাছে পেলে, গলা জড়িয়ে ধরে ফের পুরো কবিতাটি শুনিয়ে দিতে চাইতাম। আর কোথাও আটকে গেলেই আগেকার মতোই মা তাঁর মিষ্টি হাসিটি হেসে মনে করিয়ে দিতেন-“দাদুর নাকি ছিল না মা অমন বাদুড়-নাক/ঘুম দিলে ঐ চ্যাপটা নাকেই বাজতো সাতটা শাঁখ।/ দিদিমা তাই থ্যাবড়া মেরে ধ্যাবড়া করেছেন!/ অ মা! আমি হেসে মরি, ন্যাক ডেঙাডেং-ড্যাং।
এটুকু বলে, আদর করে মা আমার ‘কান মুলি’ দিতেই আমি সেই কৈশোরের দূরন্ত গতি নিয়েই দিতাম এক ছুট, আর বলে
