দু’ হাজার সতেরো সালের মার্চের একটি বিকেল, বলা যায় তখন গোধুলি নেমে আসছে। নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে একটি গাড়ী ছুটছে শহরের আরেক প্রান্তে। সেখানে বাস করছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নর্থ ক্যারোলিনা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক দম্পতি, বয়সে তরুণ। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখেই অধ্যাপক মহোদয় ডিভিডি প্লেয়ারে গান ছেড়ে দিলেন। গাড়ী ছুটেছে নিজের গতিতে NC-751 S ধরে, হাতে সময় লাগবে তিরিশ মিনিটের মতো। রাতের আলো প্রায় ঘিরে ধরছে, বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা। গাড়ীর ভিতরকার যান্ত্রিকসৃষ্ট উষ্ণতার মাঝে সুন্দর সুরে বেজে উঠলো “মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে, আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে”। প্রিয় জন্মভূমি থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে মোহনীয় সুরের মায়াজালে আকাশের দিকে তাকাতেই ঝিলমিল করে ওঠা হাজারো তারারাজি সেই কোন সুদূর থেকেই হাতছানি দিয়ে ডাকছে এই পৃথিবীর মোহাচ্ছন্ন মানবগোষ্ঠীকে।
সন্ধ্যার আকাশের এই মায়াবী রূপ দেখেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, এই সন্ধ্যার আকাশে যে বিশেষ সৌন্দর্য রয়েছে তা এমন একটি ঐক্যসূত্র, যার রয়েছে একটি নিঃশব্দ ধ্বনি যা নিজেই সংগীতময়। পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির মাঝে যে গতিময়তা তা অবলোকনে তাঁর কবিহৃদয়ে ভিন্ন ভাবনার উদয় হয়েছিল বিধায় তিনি লিখেছিলেন, এই সন্ধ্যাতারার প্রতিটি পরমাণু কম্পমান, কিন্তু এই গতিময়তার অন্তস্থলে রয়েছে শান্তি। [Thought Relics, ১৯২১, নিউইয়র্ক]। কবিমনের এই ভিন্ন ভাবনার অন্তরালে সবসময়ই কাজ করেছে গভীর অধ্যাত্মবোধ। মহাবিশ্বের অণু-পরমাণুর মধ্যে যে গতি ও শক্তি বিরাজমান, কবি তাকেই আধ্যাত্মিক বিস্ময়ে অনুভব করেছেন।
গাড়ী ছুটছে আর বারবার বেজে চলেছে ওই একটি গান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতবিতানভূক্ত ‘পূজা’ পর্যায়ের একটি অত্যন্ত গভীর অধ্যাত্মবোধের গান “মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে, আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে”। আঠারো শ ছিয়ানব্বই সালে ( আশ্বিন, তেরো শ’ তিন বঙ্গাব্দ) রচিত এই গানটি কবির ‘কাব্যগ্রন্থাবলী’-তে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এর স্বরলিপিকার হিসেবে কাঙ্গালীচরণ সেন এর নাম পাওয়া যায়। গানটি ইমনকল্যাণ রাগে এবং তেওড়া তালে নিবদ্ধ। রবীন্দ্রনাথের ‘পূজা’ পর্যায়ের অনেক গানের মতোই এখানেও উপনিষদের সেই অসীম রহস্যময় ঈশ্বরের ভাব ফুটে উঠেছে। গানটি মূলতঃ শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের শিক্ষার্থীদের উপাসনায় গাওয়ার জন্য এবং ব্রাহ্মসমাজের মাঘোৎসবের প্রার্থনা সংগীত হিসেবে রচিত হয়েছিল। তেরো শ’ ছয় বঙ্গাব্দের মাঘোৎসবের সায়ংকালীন অধিবেশনে এই গানটি প্রথম গীত হয়েছিল।
গানটি বেজে চলেছে আর হৃদয়ের গহীনে কেমন যেন একটি অনুভব ঘুরছে, ফিরছে,আবর্তিত হচ্ছে। আসলেই তো নিজেকে নিজের মাঝে গুটিয়ে নেয়া কোন এক মুহুর্তে নিজেকে যখনই এই বিশাল ব্রহ্মান্ডের বিপরীতে একাকী দাঁড় করানো যায়, তখনই ‘আমি’-র অস্তিত্ব মর্মে মর্মে উপলব্ধিতে ধরা দেয়। একান্ত অসহায়ত্বটুকু ক্ষণিকের জন্য হলেও মনের মাঝে প্রকট হয়ে দেখা দেয়। তবে তার চাইতে আরও অসীম বিশাল এক আশ্রয় যে আমাদেরকে নীরবে ধারণ করে রেখেছে, তা মনে পড়লেই আমাদের মনটা আবার বিরাট বিস্ময় আর স্বস্তি মাখানো এক মৌন-মুগ্ধতায় ভরে ওঠে। এরকম কিছু কিছু সময়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রবিঠাকুরের গান আমাদের মনের দুয়ারে বারবার আলো ফেলে।
দেশ থেকে হাজার কিলোমিটার দূরের একটি শহরের বুক চিরে ধেয়ে যাওয়া হাইওয়েতে ভেসে যাচ্ছে ইমনকল্যাণ রাগে বেঁধে নেয়া চরণ “অনন্ত এ দেশকালে, অগণ্য এ দীপ্ত লোকে”। গানটির এই পর্যায়ে এসে সৃষ্টির বিশালত্ব এবং স্রষ্টার এই বিশাল রহস্যময়তার প্রতি মানুষের বিস্ময় মাখানো অনুভূতির গভীর রূপটিতে ভিন্ন আঙ্গিকে ফুটে উঠেছে মহাবিশ্বের বিশালতা (Space) এবং মহাকালের (Time) অতল গহ্বরের প্রসংগটি। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণে এই Space এবং Time নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। স্টিফেন্স হকিন্স তো তাঁর গবেষণার পুরো সময়টাই কাটিয়ে দিয়েছেন এই বিষয়টির গভীরতা নিয়ে।
আমরা জানি যে, আইনস্টাইনের সাথে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকালে ভিন্ন প্রকৃতির দুই গুণী ভীষণ অন্তরঙ্গতায় মেতে উঠেছিলেন। কবি শুরু করেছিলেন, ‘আপনি গণিতের সাহায্যে দুটি প্রাচীনতম সত্তা ‘স্থান ও কালে’র রহস্য উদ্ধারের পেছনে ছুটছেন, আর আমি এদেশে বক্তৃতা দিয়ে চলেছি মানুষের শাশ্বত জগৎ অর্থাৎ বাস্তবতার মহাবিশ্বের ওপর’।”
দুই মনীষীর আলাপচারিতার এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মানবীয় উপাদানের সাথে সম্পর্কিত হয়ে আমাদের মহাবিশ্ব যখন ঐকতান (harmony) সৃষ্টি করে, তখন একে আমরা জানি সত্য হিসেবে, আর অনুভব করি এর অপার মহিমাময় সৌন্দর্য”। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত সাধনাই ছিল অন্তরের সেই অন্তরতম মানবটিকে খুঁজে পাওয়া, যিনি তাঁর কাছে মহামানবসদৃশ।
এই চরণের শেষ অংশ- “অনন্ত এ দেশকালে, অগণ্য এ দীপ্ত লোকে, তুমি আছ মোরে চাহি–আমি চাহি তোমা-পানে”। এখানে মানুষ (জীবাত্মা) এবং স্রষ্টার (পরমাত্মা) মধ্যকার পারস্পরিক চাহনি বা মিলনের আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। এ যেন, অসীম বিশ্বচরাচরে মানুষ যেমন স্রষ্টাকে খুঁজছে, স্রষ্টাও তেমনি মানুষের পানে তাকিয়ে আছেন। মহাকাশের অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ এবং জ্যোতির্ময় জগত অর্থাৎ অগণ্য এক আলোকোজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির মাঝে স্রষ্টা যেমন মানুষের দিকে তাকিয়ে আছেন, মানুষও তেমনি স্রষ্টার সন্ধান করছে। মহাবিশ্বের এই শান্ত ও স্তব্ধ কোলাহলহীন পরিবেশে মানুষ যখন স্রষ্টাকে তার হৃদয়ে খুঁজে পায়, তখন তার সমস্ত ভয় দূর হয়ে যায়। সে ঈশ্বরের মাঝেই নিজেকে নির্ভয় ও নিরাপদ বলে অনুভব করে।
কবির মতে, মানুষ যতই একা অনুভব করুক, সে আসলে সৃষ্টিকর্তার অসীম উপস্থিতির মাঝেই নির্ভয়ে আছে। অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝেও যে মানুষ স্রষ্টার গভীর স্নেহ ও দৃষ্টির অধীনে নিরাপদ, এই গানে সেই অভয় ও আশ্রয়ের বাণীই প্রকাশিত হয়েছে। সৃষ্টির সাথে স্রস্টার লীলাখেলার মর্মার্থ তাঁর অনুভবে বারবার নানান রূপে ধরা দেয়। তাই তাঁর কলম থেকে অবলীলায় উঠে আসে এমন চরণ-
“– হে নাথ, অবজ্ঞা করি যাও নাই ফিরে
আমার সে ধুলাস্তুপ খেলাঘর দেখে।
খেলা-মাঝে শুনিতে পেয়েছি থেকে থেকে
যে চরণধ্বনি-আজি শুনি তাই বাজে
জগৎসংগীত-সাথে চন্দ্রসূর্য-মাঝে”। [নৈবেদ্য ৩৩]
তাঁর জীবনাচরণে আমরা দেখতে পাই যে, অসীমের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ বরাবরই গুরুত্বের সাথে পরিলক্ষিত হয়েছে। অসীমের মাঝে তিনি বারবার শান্তি খুঁজতে চেয়েছেন। একদিকে তিনি গান বেঁধেছেন,
“তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে
যত দূরে আমি ধাই-
কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু,
কোথা বিচ্ছেদ নাই”।।
আবার এই যে মানবগোষ্ঠী পৃথিবীব্যাপী সকাল সন্ধ্যায় বিচরণ করছে তাদের মাঝে একেকজন যখন নিজের অবস্থান খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখন সেই সীমাবদ্ধ ব্যক্তি ‘আমি’-র মাঝে মহামানবীয় ‘আমি’ বিরাজ করে, এ ধারণাটি তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর একটি অসামান্য কবিতায়-
‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি
বাজাও আপন সুর।
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ
তাই এত মধুর। [গীতাঞ্জলী- ‘সীমায় প্রকাশ’]
এই গোটা বিশ্বজগৎ, মহাকাল এবং তার মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করে কবি বিস্ময়ে আনমনা হয়ে পড়েন।
এটি কেবল একাকিত্ব নয়, বরং স্রষ্টার মহত্ত্ব দেখে অভিভূত হওয়ার এক আধ্যাত্মিক পরমানন্দ। তাঁর প্রেম পর্যায়ভূক্ত গানগুলোতেও আমরা এই ভাবধারা দেখতে পাই। আবার পূজা পর্যায়ের একটি গান শুনতে গেলে অনেক সময় দ্বিধান্বিত হতে হয়, এটা প্রেম না পূজা। যেমন
“তুমি যে আমারে চাও আমি সে জানি।
কেন যে মোরে কাঁদাও আমি সে জানি”।।
কিন্তু শেষ চরণে এসে স্রস্টার মাহাত্ম্য সুন্দরভাবে রূপ পেয়ে যায়, যখন সুরে সুরে ধ্বনিত হয়-
“সারা হলে দে’য়া-নে’য়া দিনান্তের শেষ খেয়া
কোন্ দিক-পানে বাও আমি সে জানি”।।
এই যে অস্থির ও জটিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, তাঁর মাঝে এই গানটির আবেদন আগের চেয়েও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক এবং গভীর মনে হয়। আমাদের তথাকথিত আধুনিক জীবনে এই গানের চিরন্তন আবেদনের প্রধান কারণ, আমরা সবসময়ই মানসিক প্রশান্তি ও নিরাময়তার উপায় খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়ে যাচ্ছি। আমাদের মাঝে উদ্বেগ ও অস্থিরতা প্রবলভাবে ক্রমবর্ধমান। গবেষণায় দেখা গেছে, রবীন্দ্রসংগীতের প্রশান্ত সুর ও গভীর দার্শনিক লিরিক মানসিক চাপ কমিয়ে মানুষকে স্থির ও মনোযোগী হতে সাহায্য করে। আমাদের প্রচন্ড একাকিত্বের আধ্যাত্মিক উত্তরণের জন্য আমরা যদি একটু সময় নিয়ে এই একটি গান মন দিয়ে শুনি তবে আমরা দেখবো যে, গানটি আমাদের শেখায় এই মহাজাগতিক একাকিত্ব ভয়ের নয়, বরং এটি অসীম সৃষ্টির রহস্য অনুভব করার এবং নিজের অন্তরের পরম সত্তার সাথে যুক্ত হওয়ার একটি পথ।
আজকের পৃথিবীতে যখন যুদ্ধ, ঘৃণা ও বিভেদ বাড়ছে, তখন এই গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা সবাই সেই একই বিশাল মহাবিশ্বের অংশ। এটি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এক বিশ্বজনীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করে। অনিশ্চিত এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন গানটির শেষ পংক্তি—”এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে”—মানুষকে এক ধরনের অভয় ও পরম নির্ভরতা প্রদান করে।
এই একটি গান মনের মাঝে হাজারো ভাবনার ঝড় তুলে ফেলেছে। খানিকটা লিখতে গেলেই ভাবনার প্রকাশ বেশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আসলেই, এলোমেলো শব্দকে সঠিক বিন্যাসে সাজানোই সম্ভবত আসল চ্যালেঞ্জ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খাপছাড়া’ কাব্যের একটি বিখ্যাত পংক্তি ধার করেই বলি “সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে / সহজ কথা যায় না লেখা সহজে” । তবুও যদি সহজ কথায় বলার চেষ্টা করি তবে বলতে পারি, গানটি মানুষকে তার বাহ্যিক অস্থিরতা থেকে সরিয়ে এনে নিজের অন্তরের শান্তিময় কেন্দ্রে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যা বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসা।
রবীন্দ্র সংগীতের ভান্ডার বিশাল। বিভিন্ন সংকলন ও স্বরলিপির পাঠভেদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মোট গানের সংখ্যা ২,২২৫ থেকে ২,২৩২-এর মধ্যে উল্লেখ করা হয়। এই বিশাল সৃষ্টিরাজিকে একত্রে ‘গীতবিতান’ এর অন্তর্ভূক্তিতে মূলত পূজা, প্রকৃতি, প্রেম, স্বদেশ, বিচিত্র এবং আনুষ্ঠানিক—এই ছয়টি প্রধান পর্যায়ে বিভক্তকরা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের কাছে সংগীত ছিল পরম সত্য ও অসীমের সাথে মিলনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তিনি মনে করতেন, যা কথা দিয়ে বোঝানো যায় না, সুর সেখানে অনায়াসে পৌঁছে যায়। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন গানে কথা ও সুরের মর্যাদা সমান। তার মতে, সুর কেবল কথার বাহন নয়, বরং সুর নিজেই কথার অব্যক্ত বেদনা বা আনন্দকে ফুটিয়ে তোলে। তার কাছে সংগীত কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল আধ্যাত্মিক সাধনা। তিনি মনে করতেন সুরের মাধ্যমেই মানুষ তার ক্ষুদ্র সত্তাকে বিশ্বচরাচরের অসীম সত্তার সাথে যুক্ত করতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের হৃদয়ের রাগ-রাগিনী আসলে প্রকৃতিরই প্রতিধ্বনি। বর্ষার মেঘের ডাক বা বসন্তের বাতাসের হাহাকারই মানুষের কণ্ঠে সুরে রূপান্তরিত হয়। ধ্রুপদী সংগীতের ব্যাকরণ জানলেও তিনি তার গানে প্রথাগত রাগের কঠোর শাসন মানেননি। প্রকৃতপক্ষে, রবীন্দ্রনাথের কাছে সংগীত ছিল অন্তরের অন্তস্তলে যাওয়ার এক দিব্য সেতু। এজন্যই তো এখনও আমাদের বৈশাখ শুরু হয় তাঁর সংগীতের শুদ্ধ উচ্চারণে-
“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা।
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”
তাঁর লেখায়, গানে ও বিশ্বব্যাপী প্রদত্ত বিভিন্ন বক্তৃতায় তিনি ঐকতা ও শান্তির অন্বেষণের সন্ধান দিতে চেষ্টা করে গেছেন। আজ থেকে একশত বছর আগে, উনিশ শ’ ছাব্বিশ সালের সাতই ফেব্রুয়ারী তারিখে ঢাকার নর্থব্রুক হলে প্রদত্ত এক ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, “— আজ পৃথিবীব্যাপী দুঃখের দিনে মানুষ বলছে, শান্তি চাই। একদিন ভারতবর্ষ আত্মার মধ্যে শান্তির মন্ত্র শুনেছিল। একদা দেশে-বিদেশে সমুদ্রপর্ব্বত লঙ্ঘন করে ভারতবর্ষ শান্তির মন্ত্র প্রচার করেছিল।” অন্য একটি লেখায় কী সুন্দর আবাহন তিনি রেখে গেছেন- “‘আমি’কে যে যত দূরে সরাইয়াছে জগতের মধ্যে সে ততই সাম্য দেখিয়াছে। যেখানে যত বিবাদ, যত অনৈক্য, যত বিশৃংখলা, ‘আমি’টাই সকল নষ্টের গোড়া, যত প্রেম, যত সদ্ভাব, যত শান্তি, আমার বিলোপই তাহার কারণ”। [বিবিধ]
মহাবিশ্ব আসলে বড় একটা ক্যানভাস। এ ক্যানভাসের উপর স্রস্টা তাঁর নিপুন তুলির ছোঁয়ায় অবিরাম ছবি এঁকে যাচ্ছেন। অদ্ভূত মৌনতার সাথে তিনি সাজিয়ে নিচ্ছেন নিজের মনের রঙতুলি দিয়ে। এ যে অসীম রহস্যঘেরা একটা প্রচ্ছদ। আমরা দেখতে পাই যে, সর্বপ্রাণবাদ (Panpsychism) দর্শনের মতবাদীরা বিশ্বাস করে যে মহাবিশ্ব কেবল জড় পদার্থ দিয়ে তৈরি নয়, বরং এর প্রতিটি অংশেরই একটি অনুভব বা চেতনা (Consciousness) রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সেই ধারণার সার্থক প্রয়োগের কর্মযজ্ঞে আজীবন নিয়োজিত ছিলেন।
নর্থ ক্যারোলিনার অর্থনীতির সেই অধ্যাপক দম্পতির সাজানো ঘরটির সামনে গাড়ীটি এসে থামে। ভেতরে পা দিতেই অদ্ভূত এক মৌনতা ঘিরে ধরে। বাইরের ঠান্ডা থেকে বাঁচতে ড্রয়িং রুমে ফায়ার প্লেসের উষ্ণতা ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। ফায়ার প্লেসের ঠিক সামনে কার্পেট মোড়ানো মেঝেতে একটি বেতের ট্রে রাখা আছে, বুঝাই যাচ্ছে, আমাদেরই কোন এক গাঁয়ের কোন এক কোমল হাতের অতি যতনে বানানো বেতের ট্রে। এই দূর দেশের একটি ড্রয়িং রুমের মেঝের পরে সেই বেতের ট্রে এর মাঝে আরও যতনে রাখা আছে একটি ‘গীতবিতান’। এ যে অমূল্য সম্পদ।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা সকলে মিলে এই যে নিয়ত ছুটছি ও ঘুরপাক খাচ্ছি ভীষণ গতিতে ধেয়ে যাওয়া তথ্য কণিকার গতির সাথে তাল মিলানোর নিয়ত ছন্দের ঘূর্ণিতে, সেখানে আমরা অনুভব করছিনা মহাবিশ্বের রহস্যময় নক্ষত্রপূঞ্জের মৌন স্বকীয় স্পন্দন আমাদেরকে আলোড়িত করে চলেছে অনবরত। তারপরও কথা থেকে যায়, এই যে অসীম শূণ্যতায় ভেসে বেড়ানো মানব জাতি, তার প্রতিটি হৃদয়ে বৈশ্বিক যে সার্বজনীন চেতনা ও নির্ভয়তার সন্ধান, তা একটি সুরেই অনুরণিত হয় আমাদের অন্তরে-
“স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর–
এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে।।”
—————————————-